গৃহকর্মীর কাজ করে ছেলেকে ডাক্তার বানালেন মা

থাকার ঘরও ছিল না কৃষক স্বামী আসকর আলীর। বড় বোনের দেয়া দশ শতাংশ জমির উপর পরিত্যক্ত একটি টিনের ঘরে স্বামী ও চার সন্তানকে নিয়ে মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল রোকেয়া বেগমের (৫০)। স্বামীর সীমিত আয়ের সংসারের ছিল করুণ অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে প্রায় দুই যুগ আগে তিন মেয়ে ও এক ছেলেকে রেখে পরপারে পাড়ি জমান আসকর আলী। এ অবস্থায় সন্তানদের নিয়ে আরও অসহায় হয়ে পড়েন রোকেয়া বেগম।

এরপর অন্যের সাহায্য, সহযোগিতা, বাসা-বাড়ি আর অফিসে কাজ করে ছেলেকে বানিয়েছেন প্যারামেডিকেল ডাক্তার। শুধু তাই নয়, ছোট মেয়েকে মাস্টার্স আর মেজ মেয়েকে এইচএসসি পাস করিয়ে বিয়েও দিয়েছেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার আটিয়া ইউনিয়নের ভুরভুরিয়া গ্রামের এ সংগ্রামী নারী।

রোকেয়ার ছোট মেয়ে সাথী আক্তার (৩২) মিডিয়াকে জানান, চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আব্দুল আলিম। তার বয়স যখন ৬ বছর তখন তাদের বাবা মারা যান। বাবার বাড়ি-ঘর না থাকায় তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয় বড় খালার দেয়া একটি টিনের ঘরে। সেখানে থাকাবস্থাতেই বিয়ে হয় বড় বোনের। তার বাবার মৃত্যুর সময় মেজ বোন শিল্পী আক্তারের বয়স ১০, আর ছোট ভাই আলিমের বয়স ছিল ৪ বছর। অভিভাবকহীন এ পরিস্থিতিতে তার মা রোকেয়া বেগম বিচলিত না হয়ে সন্তানদের ভোরণপোষণের ভাবনায় শুরু করেন মানুষের বাসা বাড়ি-সহ স্থানীয় এনজিও সংস্থা আনন্দ’র কার্যালয়ে রান্না করাসহ নানান কাজ। এছাড়াও তাদের প্রাপ্তি হিসেবে ছিল খালা, খালাতো ভাই-বোনের সাহায্য সহযোগিতা আর ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া কিছু সুযোগ সুবিধা।

মায়ের এ অবর্ণনীয় কষ্ট আর ত্যাগে তার অর্জন ২০১৯ সালে কুমুদিনী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে সমাজকর্ম বিভাগ থেকে মাস্টার্স পাস। এর আগে ২০১৪ সালে ঢাকা প্যারামেডিকেল কলেজ থেকে প্যারামেডিকেল পাস করে তার ছোট ভাই আব্দুল আলিম। বর্তমানে মীরপুর-১ এর ডেলটা মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালে কর্মরত রয়েছেন তিনি। এছাড়াও মায়ের কষ্টে উপার্জিত টাকায় দেলদুয়ার কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পাস করেন তার মেজ বোন শিল্পী আক্তার। একই সঙ্গে এ উপজেলাতেই তার ও মেজ বোনের বিয়ে দিয়েছেনও তার মা।

তিনি আরও জানান, তার স্বামী ময়মনসিংহের জন উন্নয়ন ফাউন্ডেশনে কর্মরত থাকায় বর্তমানে তিনি মায়ের বাড়িতে বসবাস করছেন। তবে বর্তমানে ছোট ভাই আব্দুল আলিমের মীরপুরের বাসায় ছেলের বউ নিয়ে বসবাস করছেন তার মা রোকেয়া বেগম।

জীবন সংগ্রামী রোকেয়ার আশ্রয়দাতা বড় বোন জরিনা বেগম মিডিয়াকে বলেন, বোন জামাইয়ের কোনো বাড়ি না থাকায় তাদের থাকার জন্য টিনের একটি ঘরসহ দশ শতাংশ জমি দিয়েছিলাম। বোনের সুখের জন্য এ সাহায্যটুকু অল্প বয়সেই তার বোন আমার স্বামীহারা হয়ে পড়ে।

কান্না জড়িতকণ্ঠে তিনি বলেন, ছোট ছোট তিনটি সন্তান নিয়ে অনেক কষ্টে আর মানুষের বাসা বাড়িতে কাজ করে ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা করিয়েছে সে (বোন)। এখন আমার বোন বোকেয়ার সুখের দিন এসেছে। তার ছেলে ঢাকায় ডাক্তারি করছে। আর তিন মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। তারা সবাই ভালো আছে।

বর্তমানে তার বোন রোকেয়া ঢাকায় বসবাস করছে এ আনন্দ প্রকাশ করলেও স্বামীহারা বোনের জীবন সংগ্রামের বর্ণনা দিতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এ প্রসঙ্গে উপজেলার আটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৮নং ওয়ার্ড ভুরভুরিয়া গ্রামের তৎকালীন ইউপি সদস্য মো. দানেস আলী জানান, ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত এ ওয়ার্ডের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় অল্প বয়সে স্বামীহারা রোকেয়া বেগমকে পরিষদের ভিজিডি থেকে প্রতি মাসে ৩০ কেজি করে গম দিয়ে সহযোগিতা করেছেন তিনি। এত কষ্টের পরও ছেলেকে ডাক্তার আর মেয়েগুলোকে শিক্ষিত আর বিয়ে দিতে পারায় রোকেয়া বেগমকে স্বার্থক এক নারী বলে স্বীকৃত দিয়েছেন তিনি।