বেঁচে থাকলে বঙ্গবন্ধুর বয়স হতো একশ’ বছর

‘আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। এই দিনে ১৯২০ সালে পূর্ব বাংলার এক ছোট্ট পল্লীতে জন্মগ্রহণ করি। আমার জন্মবার্ষিকী আমি কোনোদিন নিজে পালন করি নাই-বেশি হলে আমার স্ত্রী এই দিনটাতে আমাকে ছোট্ট একটি উপহার দিয়ে থাকত। এই দিনটিতে আমি চেষ্টা করতাম বাড়িতে থাকতে। খবরের কাগজে দেখলাম ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ আমার জন্মবার্ষিকী পালন করছে। বোধ হয়, আমি জেলে বন্দি আছি বলেই। আমি একজন মানুষ, আর আমার আবার জন্মদিবস!’-(পৃষ্ঠা: ২০৯, কারাগারের রোজনামচা, শেখ মুজিবুর রহমান)
১৭ই মার্চ ১৯৬৭, তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের করা ১১ মামলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান তার ৪৭তম জন্মবার্ষিকীতে লিখেছেন এই একান্ত অনুভবের কথা।

ওই জন্মদিনে সহবন্দীরা তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন, কারাগারে কেক নিয়ে এসেছিলেন বেগম মুজিব আর ছেলে-মেয়েরা। ছোট্ট রাসেল তার বাবাকে ফুলের মালা পরিয়ে দিয়েছিল।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী আজ। তিনি বেঁচে থাকলে আজ তার বয়স হতো একশ’বছর। তিনি আমাদের দিয়েছেন স্বাধীনতা, দিয়েছেন একটা জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত আর একটা মানচিত্র। দিয়েছেন রাষ্ট্র, দিয়েছেন পরিচয়। আজ বাংলাদেশ যে বহু ক্ষেত্রে বিশ্বের কাছে রোল মডেল, তার মূলে আছে আমাদের স্বাধীনতা; আর সেই স্বাধীনতার সামনে আছেন বঙ্গবন্ধু। আমাদের দেশ যত দিন থাকবে, নদ-নদী যত দিন বইবে, তত দিনই কীর্তি থেকে যাবে বঙ্গবন্ধুর।

১৯৪৮ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই স্লোগান দিয়ে হরতাল করতে গিয়ে গ্রেফতার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তারপর থেকে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে। কতবার জেলে গেছেন! তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মুচলেকার বিনিময়ে মুক্তি দেয়ার প্রস্তাব দিতো তাকে। তিনি বলতেন, তিনি মৃত্যুবরণ করবেন, তবু বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে আপস করবেন না।

বার বার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছিলেন কিন্তু তিনি আপস করেননি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার ফাঁসি হতে পারতো। তাকে গুলি করে মারার ষড়যন্ত্রও হয়েছিল। একাত্তরে পাকিস্তানের কারাগারে তার সেলের পাশে কবরও খোঁড়া হয়েছিল। মৃত্যুকে তিনি ভয় পাননি। বলেছিলেন, ‘ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলাদেশ আমার দেশ।’

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি মুক্ত স্বদেশে ফিরে এসে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমার জীবনের সাধ পূর্ণ হয়েছে, আমার বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’
তার জীবনের একটাই ছিল সাধ, একটাই ছিল স্বপ্ন, একটাই ছিল লক্ষ্য—স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি আমাদের মধ্যে স্বাধীনতার স্বপ্ন সঞ্চারিত করেছিলেন। তিনি আমাদের ‘স্বাধীনতার অমর কাব্যের কবি’।

তিনি বলেছিলেন, তার বড় গুণ হলো দেশের মানুষকে তিনি বেশি ভালোবাসেন। তার দুর্বলতাও ছিল, দেশের মানুষকে তিনি একটুও বেশি ভালোবাসেন। রেসকোর্স ময়দানের ভাষণ শেষ করে তিনি বলেছিলেন, ‘মনে আছে, আমি বলেছিলাম, রক্তের ঋণ আমি রক্ত দিয়ে শোধ করব!’ তিনি রক্ত দিয়ে মানুষের ভালোবাসার ঋণ শোধ করেছিলেন।

তিনি নেই, তার স্বপ্নের স্বাধীন বাংলাদেশ আছে। আর আছে তার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের আদর্শ। বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু মানেই লাল-সবুজের পতাকা।