লে গেলেন খ্রিষ্টান সমাজের বর্ষীয়ান নেতা হিউবার্ট গমেজ

আজ (৫ অক্টোবর) বেলা আনুমানিক দেড়টায় ঢাকার ইম্পালস্ হাসপাতালে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের অন্যতম সভাপতি ও ঢাকা ক্রেডিটের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট হিউবার্ট গমেজ ৮৭ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এ ছাড়াও তিনি ডায়াবেটিস ও বার্ধক্যজনিত নানান জটিলতায় ভুগছিলেন।

তাঁর মৃত্যুতে খ্রিষ্টান সমাজসহ বিভিন্ন স্তরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ঢাকা ক্রেডিটের প্রেসিডেন্ট পংকজ গিলবার্ট কস্তা ও সেক্রেটারি ইগ্নাসিওস হেমন্ত কোড়াইয়া এই নেতার মৃত্যুতে খ্রিষ্টান সমাজ ও ঢাকা ক্রেডিটের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ ও আত্মার চিরশান্তি কামনা করেছেন। সেই সাথে ঢাকা ক্রেডিটের কর্মীদের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন টমাস রোজারিও শোক প্রকাশ ও তাঁর আত্মার কল্যাণ কামনা করেন।

ঢাকা ক্রেডিটের প্রেসিডেন্ট ও সেক্রেটারি যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ‘আজ আমরা একজন অভিভাবককে হারালাম। হিউবার্ট গমেজ খ্রিষ্টান সমাজের সামনের সারির একজন সাহসী নেতা ছিলেন। তিনি খ্রিষ্টান সমাজের উন্নয়নসহ সংখ্যালঘুদের নানা অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। সমবায় সমিতিসহ নানা সংগঠনে তিনি সফলতার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি আমাদের প্রাণপ্রিয় ঢাকা ক্রেডিটের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ঢাকা ক্রেডিটের উপদেষ্টা হিসেবে সেবা দিয়েছেন। আজ এই মানুষটিকে হারিয়ে আমরা সত্যিই মর্মাহত। সৃষ্টিকর্তা যেন তাঁর কর্মগুণে স্বর্গসুখ দান করেন।’

শোক প্রকাশ ও তাঁর আত্মার কল্যাণ কামনা করেছেন ন্যাশনাল কাউন্সিল অব ওয়াইএমসিএস বাংলাদেশ’র প্রেসিডেন্ট ও ঢাকা ক্রেডিটের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বাবু মার্কুজ গমেজ। তিনি বলেন, ‘এই বিদায়ী নেতার মৃত্যুতে খ্রিষ্টান সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। আমাদের উচিত তাঁকে পথ প্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করে তাঁর ভাল গুনগুলো চর্চা করা।’

এ ছাড়াও এই বর্ষীয়ান নেতার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্মল রোজারিও। তিনি এই নেতার মৃত্যুতে খ্রিষ্টান সমাজ শূণ্যতা অনুভব করছে বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘হিউবার্ট গমেজের মৃত্যুতে খ্রিষ্টান সমাজে অভাবনীয় শূণ্যতার সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর নেতৃত্ব সমাজের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আজ এই নেতাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি, সেই সাথে গভীর শোক প্রকাশ ও আত্মার কল্যাণ কামনা করি।’

বর্ষীয়ান নেতা হিউবার্ট গমেজের মৃত্যুতে আরো শোক জানিয়েছে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সংগঠন এবং অঙ্গসংগঠন।

আগামীকাল (৬ অক্টোবর) বিকাল ৩টায় ঢাকার তেজগাঁও গির্জায় শেষকৃত্যানুষ্ঠানের পর উক্ত ধর্মপল্লীর কবরাস্থানে তাঁর মরদেহ সমাধিস্থ করা হবে।

হিউবার্ট গমেজ ১৯ নভেম্বর ১৯৩৪ সালে নবাবগঞ্জের গোল্লা মিশনে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রয়াত যোসেফ গমেজ ও মাতা প্রয়াত ডমিন্ডা গমেজ। স্ত্রী প্রয়াত সুজনা কিরণ গমেজ। মৃত্যুকালে তিনি এক ছেলে, এক মেয়ে ও নাতি-নাতনি রেখে যান।

হিউবার্ট গমেজ গোল্লার সেন্ট লরেন্স প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। বান্দুরা হলিক্রস হাইস্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর পুরান ঢাকার সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল থেকে ১৯৫৪ সালে এসএসসি, ল²ীবাজারের কাইদে আযম কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগ হতে এইচএসসি ও একই কলেজ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি.কম পাস করেন।

তিনি আতাখান এন কোম্পানিতে সিএ ফার্মে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ওই ফার্মের মাধ্যমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের অডিট এবং চিফ একাউনটেন্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে ১১ বছর কাটান। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চাকরি চলাকালীন সময়ে একটি ছোট বেকারী ব্যবসা ছিল, তিনি চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়ে নিজের বেকারী ব্যবসা প্রসারের কাজ করেন।তিনি আমেরিকান এ্যাম্বাসীতে একাউনটেন্ট এবং অডিটর, ফ্রেন্ডস এন্ড বাংলাদেশ’ এনজিওর পরিচালক, খ্রিস্টান ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস-এ কনসালটেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। তিনি রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসায়ও করেন।

তিনি আমেরিকান এ্যাম্বাসীতে একাউনটেন্ট এবং অডিটর, ফ্রেন্ডস এন্ড বাংলাদেশ’ এনজিওর পরিচালক, খ্রিস্টান ইন্টারন্যাশনাল সার্ভিস-এ কনসালটেন্ট হিসেবেও কাজ করেন। তিনি রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসায়ও করেন।

সমাজ সেবায় হিউবার্ট গমেজের অবদান অসামান্য। তিনি ১৯৭২ সাল থেকে তেজগাঁও বটমলী হোমস গার্লস স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সদস্য, তেজগাঁও ধর্মপল্লীর পালকীয় পরিষদে ভাইস-প্রেসিডেন্ট, সেক্রেটারি এবং সদস্য হিসেবে, ১৯৮০-৮৩ সাল পর্যন্ত হলিক্রস গালর্স হাইস্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য ছিলেন।

ঢাকা ক্রেডিটে তিনি ১৯৬২-৬৩, ১৯৬৩-৬৪, ১৯৬৪-৬৫, ১৯৮৮-৯০ সাল পর্যন্ত চার মেয়াদে ডিরেক্টর, ১৯৯০-৯৩ সাল ভাইস-প্রেসিডেন্ট এবং ১৯৯৩-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ঢাকা ক্রেডিটের প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেবা দেন। সমবায়ে অবদান রাখার জন্য ১৯৯২ সালে জাতীয় সমবায় পুরস্কার হিসেবে স্বর্ণপদক গ্রহণ করেন। ১৯৯৭-২০০০ সালে তিনি দি মেট্রাপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটির চেয়ারম্যান এবং ২০০০-২০০৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে গোল্লা কো-অপারেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন।

১৯৭৭ সালে দি মেট্রোপলিটন খ্রীষ্টান কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ডানিয়েল কোড়াইয়া পরামর্শের জন্য তাঁর কাছে আসেন। তিনি কোড়াইয়ার সুন্দর প্রস্তাবে রাজি হন এবং সর্বাত্মক সহযোগিতা করেন। তিনি তৎকালীন তেজগাঁও চার্চ কমিউনিটি সেন্টারের ভবন নির্মাণ কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন।

হিউবার্ট গমেজ ১০ বছর হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদের প্রেসিডিয়াম সদস্য ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি এর অন্যতম সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ খ্রীষ্টান এসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ও ট্রেজারার হিসেবে কাজ করেন।