স্মার্টফোনেই শনাক্ত হবে ম্যালেরিয়া

বর্তমানে ম্যালেরিয়া রোগ শনাক্তে রক্তের প্রয়োজন হয়। অনেকেই ইনজেকশনে রক্ত দিতে ভয় পায়। আর তা সময়সাপেক্ষ। তবে মার্কিন গবেষকরা স্মার্টফোনের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া রোগ শনাক্তের নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন। পাশাপাশি হার্টের সমস্যাও নির্ণয় করা যাবে স্মার্টফোনের সাহায্যে।

গত জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সিনসিনাটি বিশ^বিদ্যালয়ের গবেষক স্থিতধী ঘোষ ও তার সহযোগীদের একটি গবেষণাপত্র ‘নেচার’ গ্রুপের আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান জার্নাল ‘মাইক্রোসিস্টেমস অ্যান্ড ন্যানোইঞ্জিনিয়ারিং’ এ প্রকাশিত হয়েছে।

বিভিন্ন রোগের ইঙ্গিত মিলবে কীভাবে?

রক্ত বা নানা ধরনের দেহরস (‘বডি ফ্লুইড’) অথবা থুতুতে (‘স্যালাইভা’) নানা ধরনের হরমোন ও প্রোটিন থাকে। বিজ্ঞানের পরিভাষায় যাদের বলা হয়, ‘বায়ো-মার্কার্স’। তাদের মধ্যে অন্যতম- ‘কর্টিসল’, ‘আলফা অ্যামাইলেজ’ ও ‘প্যারা-থাইরয়েড হরমোন (পিটিএইচ)। যেগুলি নানা ধরনের সংক্রমণের সঙ্গে জড়িত। বিভিন্ন সংক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে রক্ত, নানা ধরনের দেহরস ও থুতুতে এদের পরিমাণের তারতম্য ঘটে।

যদি পরীক্ষায় তারতম্য ঘটে তা স্মার্টফোন থেকেই জানা যাবে। এ পরীক্ষা স্মার্টফোনের সঙ্গে জোড়া খুব পাতলা আর ছোট্ট একটি চিপে থু থু ফেলেই শনাক্ত করা যাবে।

চালু পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা

এই পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশে ডায়াবেটিস ও মাতৃত্বের প্রাথমিক পরীক্ষা চালু হয়েছে বেশ কিছু দিন। কিন্তু ম্যালেরিয়া বা মানসিক অবসাদের মাত্রা বোঝার ক্ষেত্রে এটা এখনও চালু হয়নি।

এখনকার পদ্ধতির আরও একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। শুধুই ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলা যায়। বলা যায়, কেউ মা হতে চলেছেন কি না অথবা কারও ডায়াবেটিস হয়েছে কি হয় নি। তার বেশি নিখুঁত ভাবে কিছু বলা সম্ভব হয় না।

কিন্তু ম্যালেরিয়ার সংক্রমণ বুঝতে হলে তার মাত্রাটা বোঝা জরুরি। জানা দরকার, রক্তে ম্যালেরিয়ার বাহক পরজীবী ‘প্লাসমোডিয়াম ফ্যালসিপেরাম’ কী পরিমাণে ঢুকেছে?

প্রকল্পের সাথে জড়িত গবেষক স্থিতধীর বলেন,‘‘এই পরজীবী ঢুকলেই রক্তে এক ধরনের প্রোটিনের পরিমাণ স্বাভাবিকের ৩/৪ গুণ হয়ে যায়। প্রোটিনটির নাম- ‘হিস্টাডাইন রিচ প্রোটিন (এইচআরপি-২)’। তখন প্রতি মিলি লিটার রক্তে এইচআরপি-২ থাকে অন্তত ৮ ন্যানোগ্রাম করে।’’

কিন্তু স্মার্টফোনে রক্ত পরীক্ষার চালু পদ্ধতিতে নিখুঁত ভাবে সেই পরিমাণটা মাপা অসম্ভব। ফলে রক্তপরীক্ষা করানোর জন্য ডাক্তারের শরণাপন্ন হতেই হবে। অর্থাৎ শুধু ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছি কি না জানতে, বুঝতেই চিকিৎসক লাগছে, প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ করতে হচ্ছে।

স্থিতধীর পদ্ধতির অভিনবত্ব কোথায়?

স্থিতধীর উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে সে সবের প্রয়োজনই হবে না। কেন? গবেষকরা তার জন্য একটি চিপ বানিয়েছেন। লম্বা ও চওড়ায় যা ৩ সেন্টিমিটার করে। মাত্র ১ মিলিমিটার পুরু। সেই চিপেই থাকবে প্লাস্টিকের একটি কুয়ো বা গর্ত। যা ভরা থাকবে বিশেষ একটি অ্যান্টিবডিতে। রক্ত বা থুতু চিপে ফেললে তাতে মিশে থাকা প্রোটিন বা হরমোনকে (অ্যান্টিজেন) গায়ে সাঁটিয়ে নিতে বা বেঁধে ফেলতে পারবে সেই অ্যান্টিবডি। তাই এই অ্যান্টিবডিগুলিকে বলা হয়, ‘ক্যাপচার অ্যান্টিবডি’। চিপে আরও এক ধরনের অ্যান্টিবডি রেখেছেন স্থিতধীরা। তার নাম- ‘ডিটেকশন অ্যান্টিবডি’। রক্ত বা থুতু থেকে আসা হরমোন বা প্রোটিনের একটা দিক ক্যাপচার অ্যান্টিবডি ধরে থাকে, অন্য দিকটি ধরা থাকে ‘ডিটেকশন অ্যান্টিবডি’-র সঙ্গে। ডিটেকশন অ্যান্টিবডিগুলির সঙ্গে থাকে উৎসেচকও।

ডিটেকশন অ্যান্টিবডিগুলিই বলে দিতে পারে, সংক্রমণ বা কোনও রোগের ফলে রক্তে ঠিক কতটা বেড়েছে কোনও বিশেষ হরমোন বা প্রোটিনের পরিমাণ। যার থেকে হিসাব কষে বলে দেওয়া যায়, ম্যালেরিয়ার পরজীবীরা কী পরিমাণে রক্তে ঢুকে ও ছড়িয়ে পড়েছে।

দেহে হরমোন-প্রোটিনের কম-বেশি কীভাবে বোঝা যাবে?

গবেষক স্থিতধী জানিয়েছেন, চিপে একটি কেমোলুমিনোসেন্ট পাউডার রাখা আছে। দু’ধরনের অ্যান্টিবডির সঙ্গে রক্ত বা থুতু থেকে এসে মিশছে যে হরমোন বা প্রোটিন, তাদের বিক্রিয়ায় ওই পাউডারের জন্যই আলো বেরিয়ে আসবে। সেই আলো দেখেই বোঝা যাবে সংক্রমণ হয়েছে কি না। এই আলোটা পাওয়ার জন্য বাইরে থেকে আলো ফেলতে হচ্ছে না। আলোর জন্ম হচ্ছে বিক্রিয়াজাত শক্তি থেকেই। সেই আলোর উজ্জ্বলতার বাড়া-কমা মেপে আমার, আপনার স্মার্টফোনে ডাউনলোড করা একটি অ্যাপ জানিয়ে দেবে, সংক্রমণের মাত্রা কতটা? আর সেটা করা সম্ভব হবে খুব সামান্য বিদ্যুৎশক্তিতেই।

এই পদ্ধতির সুবিধা কী কী?

ডায়াবেটিস, মাতৃত্বের পরীক্ষার জন্য চালু পদ্ধতিতে যেখানে প্রয়োজন অন্তত ১৫০ মাইক্রো-লিটার রক্ত, সেখানে এই পদ্ধতিতে রক্ত লাগবে মাত্র ২০ মাইক্রো-লিটার। আর মাত্র ৩০ মাইক্রো-লিটার থুতু চিপে ফেলতে পারলেই তাতে মিশে থাকা কর্টিসল হরমোনের পরিমাণ বেড়েছে কি না বা কতটা বেড়েছে, তা জেনে নেওয়া সম্ভব হবে আমাদের। অবসাদ (ডিপ্রেশন), চাপ (স্ট্রেস) ও উদ্বেগে (অ্যাংজাইটি)-র মতো মানসিক রোগে আমরা ভুগছি কি না, তা জানার জন্য স্মার্টফোনে হেল্থ-অ্যাপ চালু হয়েছে কিছু দিন ধরে। কিন্তু কতটা অবসাদ বা মানসিক চাপে অথবা উদ্বেগে ভুগছি আমরা, তার সঠিক পরিমাপ করা এখনও সম্ভব নয় এই অ্যাপগুলির মাধ্যমে।

স্থিতধীরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, এ বার যাতে সেই সমস্যারও সুরাহা হয়।