ওরা চেয়েছিল, দুজনের মৃ’ত্যু একসঙ্গেই হবে!

মঙ্গলবার মধ্যরাত। ঢাকার রাজপথ একেবারেই ফাঁকা। হঠাৎ সংবাদ আসে- মহাখালী ফ্লাইওভারে ওঠার মুখে সেতুভবনের সামনে একটি গাড়ির ধাক্কায় স্কুটিতে থাকা দুই তরুণী নিহত হয়েছেন। তাদের বাইকের পেছনে লেখা রয়েছে ‘প্রেস’। দুই তরুণীকে সংবাদকর্মী ভেবে যোগাযোগ চলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। কিন্তু না, কেউ তাদের পরিচয় দিতে পারছিলেন না।

পরে পুলিশ জানাল- নিহতদের একজন সৈয়দা কচি (৩৮), কাজ করতেন উত্তরার একটি প্রতিষ্ঠানে। অন্যজন সোনিয়া আক্তার (৩২) এক সময় অনলাইনে মার্কেটিংয়ের কাজ করলেও এখন কিছুই করতেন না। বনানী থানার ওসি নুরে আজম মিয়া জানান, প্রাথমিকভাবে

নিশ্চিত হওয়া গেছে এটি সড়ক দুর্ঘটনা। অজ্ঞাত কোনো গাড়ির ধাক্কায় ওই দুই তরুণীর মৃত্যু হয়েছে। তবে কোন গাড়ি এ দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে, তা সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। এদিকে দুর্ঘটনার শিকার স্কুটির পেছনে নম্বরপ্লেটে ‘প্রেস’ লেখা ছিল। যদিও নিহত দুজনের কেউ গণমাধ্যমে কাজ করেন, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

পুলিশ ও পরিবার জানায়, সৈয়দা কচির বাড়ি কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর পৌরসভার পাচুলিয়ার বাজিতপুর এলাকায়। মৃত সৈয়দ ফজলুল হকের মেয়ে কচি উত্তরায় পার্ল ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানে টেরিটরি অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আট বছর ধরে তিনি এ চাকরি করছেন। বড়বোন চুমকির সঙ্গে কল্যাণপুরের একটি বাসায় ভাড়া থাকতেন। চলাফেরা করতেন নিজেই স্কুটি চালিয়ে। অন্যদিকে নিহত সোনিয়ার গ্রামের বাড়ি ভোলা সদর উপজেলার মাকবেদুরিয়া গ্রামে। বাবা নুরুল আমিন। পরিবারের সঙ্গে থাকতেন শাহআলী থানার পাশে।

গতকাল বুধবার দুপুরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে মেয়ের লাশ নিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন সোনিয়ার মা মনোয়ারা বেগম এবং তার স্বজনরা। মনোয়ারা বলেন, ‘পাঁচ বছর আগে একটি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিংয়ের কাজ করতে গিয়ে সোনিয়ার সঙ্গে কচির পরিচয় হয়। তার পর থেকেই তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। সোনিয়া কাজ ছেড়ে দিলেও কচি একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরি করত। এর পরও দুজনের বন্ধুত্বে কোনো ভাটা পড়েনি। দিনের অধিকাংশ সময় তারা একসঙ্গেই থাকত।’

তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে দুদিন (সোমবার) আগে কচির বাসায় গিয়েছিল। মঙ্গলবার বনানীতে তাদের এক বন্ধুর বাসায় যায়, ফেরার পথেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।’ কাঁদতে কাঁদতে তিনি আরও বলেন, ‘রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তারা ছিল আত্মার আত্মীয়। বন্ধুত্ব হওয়ার পর থেকে একজন অপরজনকে না দেখে একটি দিনও থাকতে পারত না। ওরা বলত- মৃত্যুও আমাদের আলাদা করতে পারবে না। আমাদের মৃত্যু একসঙ্গেই হবে। ওদের সে ইচ্ছাটাই যেন পূর্ণ করলেন সৃষ্টিকর্তা। মৃত্যুও ওদের আলাদা করতে পারেনি।’

সোনিয়ার ভাই ফারুক হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, ‘সোনিয়া আগে অনলাইনে কসমেটিকসের ব্যবসা করতেন। এর সূত্র ধরে ভারতে তার যাওয়া-আসা ছিল। ৯ মাস আগে ভারতের মহারাষ্ট্রের নাগরিক সৈয়দ মহসিন নামে এক যুবকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এর পর কয়েক মাস তিনি সেখানেই ছিলেন। পরে দেশে ফিরে আসেন। আবারও স্বামীর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।’

নিহত কচির মামা অ্যাডভোকেট নুরুল আমিন জানান, মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে কচির নিউজ ও ছবি দেখে একজন তাকে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানান। এর পর ভোরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে এসে তিনি কচির মরদেহ শনাক্ত করেন। কচি সকাল ৯টায় বাসা থেকে বের হয়ে অফিসে যেতেন। আবার রাত ১১টার আগেই বাসায় ফিরতেন। তবে মঙ্গলবার রাতে বান্ধবীকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছিলেন, তা তিনি জানেন না।

ডেমরায় ট্রাকের ধাক্কায় দুজন নিহত : ডেমরার কোনাপাড়ায় বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেলচালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ওমর ফারুক ঐশিক (১৮) ও কিবরিয়া নাদিম আকাশ (২০)। এর মধ্যে ঐশিকের স্থানীয় একটি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। থাকতেন কোনাপাড়া এলাকায়। আকাশ অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তিনি অবশ্য কিছু করতেন না। ডেমরা থানার এসআই নাসির উদ্দিন জানান, দুর্ঘটনার পর তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। রাতে চিকিৎসাধীন তারা মারা যান।

বাসাবোতে যুবক নিহত : সবুজবাগ থানার ওসি মাহবুব আলম জানান, বুধবার বিকালে বাসাবো ফ্লাইওভারে ওঠার আগে দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে সাগর আহমেদ (৩০) নামে এক যুবক নিহত হন। একটি মোটরসাইকেল সঠিক লেনে চললেও অপরটি আসছিল উল্টোপথে। এ ঘটনায় অপর মোটরসাইকেলের আরোহী রাজু গুরুতর আহত হন। তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আর সাগরের লাশ রাখা হয়েছে একই হাসপাতাল মর্গে।